ছোট ফ্ল্যাটে বেশি ভাড়া পেতে চান? আর্কিটেক্টকে এই কথাগুলো বলুন
- anjoncucse
- 16 hours ago
- 4 min read
গত সপ্তাহে এক ভদ্রলোক ফোন করলেন। বললেন, মিরপুরে তাঁর একটা ছোট জমি আছে। সাড়ে তিন কাঠা। জমিটায় একটা ছোট অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং করতে চান। ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দেবেন।
তাঁর প্রশ্ন ছিল একটাই, ফ্ল্যাট ছোট হলে কি ভাড়া কম পাবো?
উত্তরটা সোজা, নির্ভর করে।
একই এলাকায় একই রাস্তায় পাশাপাশি দুটো ফ্ল্যাট, অথচ একটার ভাড়া ১৫ হাজার আর অন্যটার ২০ হাজার টাকা। দুইটার আয়তন এক। কিন্তু একটায় ঢুকলে মনে হয় ফাঁকা, আলো-বাতাস আছে। আরেকটায় ঢুকলে মনে হয় কেউ যেন চেপে ধরেছে।
তফাতটা আসে design থেকে। মানে architect কীভাবে ফ্ল্যাটটা plan করেছেন, সেখান থেকে। রুমগুলো কোথায়, কীভাবে, করিডোর কতটুকু, বাথরুম কোন দিকে, রান্নাঘর কোথায়। এই সবকিছু ঠিক হয় building design এর সময়। মানে architect এর টেবিলে।
ফ্ল্যাট বানানোর পর এগুলো বদলানো যায় না। দেয়াল তো আর সরানো যায় না।
তাই ভালো ভাড়া পেতে হলে ভাবনাটা শুরু করতে হবে নকশার সময় থেকেই।
আলো আর বাতাস
ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট দেখতে গেলে প্রথম যে জিনিসটা টের পাওয়া যায়, ঘরটা অন্ধকার কি না।
একটু ভাবুন তো। আপনি একটা ফ্ল্যাট দেখতে গেলেন। দরজা খুলে ঢুকলেন। ভেতরে অন্ধকার। লাইট জ্বালাতে হলো দুপুরবেলাতেও। আপনার মনে কী হবে?
ভাড়া যতই কম হোক, মন চাইবে না।
এখন ৭০০ sqft এর একটা ফ্ল্যাটে যদি cross ventilation থাকে, মানে দুই দিক দিয়ে বাতাস আসা-যাওয়া করতে পারে, সেই ফ্ল্যাট ৯০০ sqft এর অন্ধকার ফ্ল্যাটের চেয়ে বড় মনে হবে। এটা মনের ব্যাপার। কিন্তু ভাড়াটিয়া তো মন দিয়েই সিদ্ধান্ত নেন।
Architect কে বলুন, প্রতিটা রুম-এ অন্তত একটা জানালা রাখতে। আর সম্ভব হলে ফ্ল্যাটের দুই পাশে জানালা রাখতে যাতে বাতাস চলাচল করে। এটাকে cross ventilation বলে। সহজ কথায় বাতাসের রাস্তা।
ঢাকার গরমে যে ফ্ল্যাটে ভালো বাতাস ঢোকে, সেই ফ্ল্যাটে AC এর বিল কম লাগে। ভাড়াটিয়া এটা বোঝেন।

করিডোর
ছোট ফ্ল্যাটে সবচেয়ে বড় অপচয় হলো করিডোর। মানে এক রুম থেকে অন্য রুমে যাওয়ার রাস্তা।
অনেক ফ্ল্যাটে দেখবেন লম্বা একটা করিডোর আছে। একপাশে ঘর, একপাশে ঘর। দেখতে সুন্দর হতে পারে। কিন্তু ৭০০ sqft ফ্ল্যাটে যদি ৮০-১০০ sqft করিডোরে চলে যায়, তাহলে আপনি আসলে ৬০০ sqft ফ্ল্যাট বানাচ্ছেন।
সেই ১০০ sqft এর জন্য আপনি ইট কিনেছেন, রড দিয়েছেন, সিমেন্ট ঢেলেছেন। কিন্তু সেখানে কেউ বসবে না। শুধু হেঁটে যাবে।
ভালো architect করিডোর কমিয়ে আনতে পারেন। ঘরগুলো এমনভাবে সাজাতে পারেন যাতে কম রাস্তা দিয়ে সব ঘরে যাওয়া যায়। এটাকে বলে efficient layout। বাংলায় বললে, জায়গার সদ্ব্যবহার।
রুমের আকৃতি
এটা একটা মজার বিষয়। একটু ভাবুন।
১০ ফুট চওড়া আর ১২ ফুট লম্বা একটা ঘর। আরেকটা ঘর ৮ ফুট চওড়া আর ১৫ ফুট লম্বা। দুইটার আয়তন প্রায় কাছাকাছি। কিন্তু প্রথমটায় একটা ডাবল বেড, দুই পাশে নাইট টেবিল, সামনে আলমারি, সব গুছিয়ে রাখা যায়। দ্বিতীয়টায়? বেড রাখলে পাশ দিয়ে হাঁটা কঠিন।
ঘরের proportion মানে দৈর্ঘ্য আর প্রস্থের অনুপাত। ছোট ফ্ল্যাটে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভাড়াটিয়া নিজের আসবাব আনবেন। সেই আসবাব যদি ঘরে না ধরে, তাহলে ফ্ল্যাটটা অকেজো মনে হবে।
Architect কে বলুন — ঘর হবে যতটা সম্ভব বর্গাকার। লম্বা সরু ঘর এড়িয়ে চলুন।
রান্নাঘর আর বাথরুম
রান্নাঘর আর বাথরুম দুইটাতেই পানির পাইপ লাগে। drain লাগে। gas line লাগে রান্নাঘরে। এখন যদি রান্নাঘর ফ্ল্যাটের এক মাথায় থাকে আর বাথরুম আরেক মাথায়, তাহলে অনেক পাইপ টানতে হয়। খরচ বাড়ে। আর ভবিষ্যতে লিক হলে ঠিক করাও কঠিন।
এটাকে বলে wet zone planning। মানে যেসব ঘরে পানি ব্যবহার হয়, সেগুলো কাছাকাছি রাখা। plumbing এর খরচ কমে। maintenance সহজ হয়। আর বাকি ঘরগুলো, শোবার ঘর, বসার ঘর, এগুলো dry zone এ থাকে। পানির ঝামেলা থেকে দূরে।
ছোট ফ্ল্যাটে storage
বাংলাদেশে মানুষ জিনিসপত্র রাখতে ভালোবাসেন। এটা দোষ না — প্রয়োজন। শীতের কাপড়, বর্ষার ছাতা, পুরোনো কাগজপত্র, ছেলেমেয়ের বই, সব রাখতে হয়।
ছোট ফ্ল্যাটে আলমারি কিনলে ঘর ছোট হয়ে যায়। কিন্তু যদি ফ্ল্যাটের design এই কিছু built-in storage থাকে?
দরজার উপরে দেয়ালে লফ্ট করা যায়, মানে উপরে একটা বদ্ধ তাক। যেখানে মৌসুমি জিনিস রাখা যায়। বেডরুমের দেয়ালে niche রাখা যায়, মানে দেয়ালের ভেতরে তাক বানানো। এগুলো আসবাব না। এগুলো building এর অংশ।
এই ছোট ছোট জিনিস ভাড়াটিয়ার চোখে ফ্ল্যাটের মূল্য অনেক বাড়িয়ে দেয়।

সুইচবোর্ড কোথায়
এইবার একটু ভিন্ন কথা বলি।
ফ্ল্যাটে ঢুকে ভাড়াটিয়া যা দেখেন — ঘরের সাইজ, আলো, বাতাস। কিন্তু যখন থাকতে শুরু করেন, তখন যেটা বিরক্তির কারণ হয় — সুইচবোর্ড ভুল জায়গায়।
বেডরুমে AC লাগাবেন, কিন্তু AC point নেই। TV রাখবেন এক দেয়ালে, কিন্তু socket অন্য দেয়ালে। রান্নাঘরে ফ্রিজ রাখার জায়গায় plug নেই। extension cord টানতে হয় সারা ঘরে।
একটু সময় নিয়ে ভাবুন, ভাড়াটিয়া কোন ঘরে কোথায় কী রাখবেন। সেই অনুযায়ী electrical point, AC point, TV point ঠিক করুন। এই কাজটা নকশার সময় হয়। পরে দেয়াল কেটে করতে গেলে দেখতেও খারাপ, খরচও বেশি।
বারান্দার কথা
ঢাকা-চট্টগ্রামে বারান্দা একটা আলাদা বিষয়।
অনেক ফ্ল্যাটে বারান্দা আছে, কিন্তু এত ছোট যে দাঁড়ানো যায়, বসা যায় না। অথবা এমন জায়গায় যে রোদ পড়ে সারাদিন, কেউ বের হতে চায় না। অথবা পাশের বিল্ডিং এত কাছে যে বারান্দায় গেলে প্রাইভেসি নেই।
বারান্দা যদি কাজের হয়, তাহলে সেটা ফ্ল্যাটের একটা বড় আকর্ষণ। কাপড় শুকানো যায়, একটু বসা যায়, একটু বাতাস খাওয়া যায়।
ছোট ফ্ল্যাটে বড় বারান্দা দেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু যেটুকু দেবেন, সেটা যেন ব্যবহারযোগ্য হয়।

খরচের হিসাব
এখন আপনি ভাবছেন, এত কিছু করলে তো বানানোর খরচ বাড়বে।
আসলে বাড়বে না। বরং কমবে।
করিডোর কমানো মানে কম জায়গায় ইট-রড-সিমেন্ট লাগছে। wet zone একসাথে রাখা মানে plumbing এর খরচ কম। built-in storage মানে সামান্য ইটের-বোর্ড এর কাজ।
আসল খরচ হলো ভাবনার। মানে architect কে সময় দিতে হবে। তাঁকে বলতে হবে, শুধু ঘর আঁকবেন না, ভাবুন। ভাড়াটিয়া কীভাবে থাকবেন সেটা ভাবুন।
একজন ভালো architect এই কাজটা করেন। এবং এই কাজের জন্য একটু বেশি fee দিলেও আপনি ফ্ল্যাট থেকে প্রতি মাসে তিন-পাঁচ হাজার টাকা বেশি ভাড়া পাবেন। দশ বছরে হিসাব করুন — অনেক টাকা।

ছোট ফ্ল্যাট মানে খারাপ ফ্ল্যাট না। ছোট ফ্ল্যাট মানে চিন্তা করে বানানো ফ্ল্যাট হওয়া উচিত।
ঢাকা-চট্টগ্রামে ছোট পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। তরুণ দম্পতি, ছোট চাকরিজীবী পরিবার, তাঁরা বড় ফ্ল্যাট চান না। তাঁরা চান ভালো ফ্ল্যাট। যেখানে আলো আছে, বাতাস আছে, জায়গাটুকু কাজে লাগে।
আপনার জমি ছোট হতে পারে। কিন্তু সেই ছোট জমিতে যদি ভালো নকশার ফ্ল্যাট হয়, তাহলে ভাড়াটিয়ার অভাব হবে না।
ভালো ফ্ল্যাট বানাতে লাখ লাখ টাকা বেশি লাগে না। একটু বেশি ভাবনা লাগে। সেই ভাবনাটা যদি ডিজাইন এর সময় হয়, তাহলে বাকি সব সহজ হয়ে যায়।




Comments